Saturday, 3 October 2020

সেমন্তী ঘোষ


ত্রিবেণী সঙ্গম: কন্যাকুমারী  

সেমন্তী ঘোষ


"...দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে..."


পূণ্যভূমি ভারত বৈচিত্রের মিলনতীর্থ। ঐক্যের সাধনাই তার শাশ্বত সাধনা। বিমিশ্র বিচিত্র সংস্কৃতির সাথে রূপের বাহারে অনন্য তার রূপ। সেই রূপের ডালি আলোকিত করে তোলে আমাদের জ্ঞানভান্ডার। অজানাকে জানার অচেনাকে চেনার মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় জ্ঞানচক্ষু। শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষায় আবদ্ধ না থেকে প্রকৃতির মাঝে নব নতুন কর্মসূচির সাথে মেলবন্ধন ঘটে আমাদের।


ভারতের শেষ বিন্দু কন্যাকুমারী― আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের ত্রিবেণী সঙ্গম। শৈশবকালের ভূগোল বইয়ের পাঠ্য উত্তরে কাশ্মীর থেকে সুদূর দক্ষিনের কন্যাকুমারী চির আকর্ষণীয়। প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নিয়ে এবারে আমাদের যাত্রা সেই কন্যাকুমারীতে। কাজের সূত্রে আমাদের বহুবার যাওয়া হলেও ওদের অনেকের কাছেই এটা প্রথমবার। তাই প্রত‍্যেকের চোখ-মুখ আনন্দ, উত্তেজনায় পরিপূর্ণ।

হাওড়া থেকে কন্যাকুমারী এক্সপ্রেস এ করে যাওয়া যায় কন‍্যাকুমারী অথবা হাওড়া থেকে চেন্নাই গামী যেকোনো ট্রেনে চেন্নাই গিয়ে  সেখান থেকে কন্যাকুমারী পৌঁছানো যায়। শালিমার নাগেরকোয়েল গুরুদেব এক্সপ্রেসে চেপে পৌঁছাতে পারেন নাগেরকোয়েল। সেখান থেকে কন্যাকুমারী দূরত্ব আনুমানিক ২০ কিলোমিটার।এছাড়াও কলকাতা থেকে ভায়া চেন্নাই হয়ে বিমানে ত্রিবান্দম এসে সেখান থেকে কন্যাকুমারী পৌঁছানো যায় দূরত্ব আনুমানিক  ৯০ কিলোমিটার। আমাদের যাত্রা ছিল হাওড়া কন্যাকুমারী এক্সপ্রেসে।


দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু জেলার উপকূলীয় অঞ্চল কন‍্যাকুমারী সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। বহু বাঙালির দেখা মিললেও এখানকার আধিকারিক ভাষা তামিল। ২০১১ সালের জনসংখ্যা অনুযায়ী এখানকার লোকসংখ্যা ২৯৭৬১ জন। এসব গল্প দিয়েই শুরু হলেও দীর্ঘ তিন দিনের ট্রেনযাত্রা। বেশ কিছুক্ষণ গল্প করার পর সাথে নিয়ে যাওয়া খাবার খেয়ে শুয়ে পড়া হলো। কয়েকজন দুষ্টু-মিষ্টুর রাত্রি জাগরণের ইচ্ছা থাকলেও  দিদির বকা খাওয়ার ভয়ে দেখলাম সবাই নিদ্রামগ্ন। কিন্তু পরেরদিন সকাল হতেই  উঠে আবার তাদের বায়না দিদি কন্যাকুমারীর গল্প বলো... স্নেহের প্রিয়দের আবদারে তাই আবার শুরু করলাম পুরাণ অনুযায়ী দেবী কন্যাকুমারীর নামানুসারে এই অঞ্চলটির নামকরণ হয়েছে কন্যাকুমারী। তপস্যারত 'মহাশক্তি মহামায়া' ধ্যানমগ্না কন্যাকুমারী শিবের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় দেবতাদের কৌশলে বধ করেছিলেন বানাসুরকে। তারপর আবার সেই ত্রি-সঙ্গম  কুমারিকায় চিরকুমারী মগ্ন হয়েছিলেন চিরবাঞ্চিত দেবাদিদেবের ধ্যানে। তখন থেকেই পবিত্র তীর্থভূমি কন্যাকুমারী রূপে খ্যাত। শুধু তাই নয় ত‍্যাগ ও সাধনার মূর্ত প্রতীক স্বামী বিবেকানন্দ সাঁতরে কন্যাকুমারী পৌঁছে এখানেই ধ্যানে মগ্ন হয়ে দেশবাসীর ভূত ভবিষ্যতের চিন্তায় নিমজ্জিত  হয়েছিলেন। দিনটি ছিল ২৪শে ডিসেম্বর ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ। শোনা যায় ২৫ থেকে ২৭শে ডিসেম্বর শ্রী পাদপারাই  প্রস্তরখন্ডের উপর বসে তিনি নিজের জীবনের উদ্দেশ্যের সন্ধান পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তারই স্মারক হিসেবে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল। এসবের সাথে মনোরমা প্রকৃতির অপরূপ শোভা তো রয়েছেই।এভাবেই গল্পে ছবি দেখে তিন দিন অতিবাহিত। পৌঁছে গেলাম কন্যাকুমারী। যার স্থানমাহাত্ম্যে দেহ মন উদাস হয়। পবিত্র করে তোলে অন্তরাত্মা কন্যাকুমারীর আকাশ বাতাস। তিনদিনের দীর্ঘ জার্নিতে দুপুরটা বিশ্রাম নিয়েই কাটলো। বিকালে যাওয়া হল সমুদ্রের ধারে। আসমানী নীল কার নীলাভ্র জলে মোহময়ী রূপের ছটা।সাগরতটের উদাসিয়া সুর। সিঁদুর রাঙা অস্তগামী সূর্যের রক্তিম হাসিতে গোধূলিবেলার ঝিরঝিরে সমীরন― 

নীলাভ আকাশতটে দুর্লভ জ্যোতি

দুরন্ত দুর্বার অসীমের গতি...

দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির অসীমের মাঝে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে মুহূর্তকে মুহূর্ত বন্দি করে হোটেলে ফেরা হল। পরেরদিন প্রভাতে হোটেলের ছাদ থেকে  দেখা গেল সূর্যোদয়ের অপরূপ দৃশ্য। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রেডি হয়ে বেরোলাম বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল এর উদ্দেশ্যে। কন্যাকুমারী থেকে সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত ভেসেল চলে বিবেকানন্দ রকে যাওয়ার জন্য। সকাল থেকেই সেখানে সুদীর্ঘ সারিতে জনমানবের ঢল। লাইনে দাঁড়িয়ে দেখলাম বেশ কিছু জন এগিয়ে চলেছে কন্যাকুমারী মাতার মন্দির দর্শনে। আমরা এগিয়ে গেলাম ফেরিঘাটের দিকে। লাইফ জ্যাকেট পড়ে ভেসেলে উঠে ১৫ মিনিটের ব্যবধানে উজানের হাওয়ায় দুলতে দুলতে পৌঁছে গেলাম বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল। আনুমানিক চার একর জমির ওপর ২০৮১ দিনের প্রচেষ্টা ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল।

সেখানে রয়েছে বিবেকানন্দের একটি সৌম‍্য মূর্তি; যেটির অঙ্কন নির্মাণ করেছিলেন সি.এস.এম পন্ডিত এবং মূর্তিটির নির্মাণকার্য সম্পন্ন করেছিলেন  জে. জে. স্কুল অব্ আর্টস এর সি.এন.এল. সোনাভাদোকর।মূর্তি ছাড়াও এখানে একটি প্রার্থনা গৃহের সাথে রয়েছে বেশকিছু পুস্তক বিপণি। স্থাপত্য ভাস্কর্য কলার অপূর্ব নিদর্শন এটি। রক মেমোরিয়াল এর বিপরীতে দেবী কন্যাকুমারীর একটি পায়ের স্মারক শিলাখণ্ড রূপে রয়েছে। ভিতরের ছবি তোলা নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য বাইরে থেকে ফ্রেমবন্দি করে বিবেকানন্দ রকে দাঁড়িয়ে আরব সাগর ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলটি প্রাণভরে দেখলাম।  তিনসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে বেলাভূমিতে দূরন্ত হাওয়ায় মনে নিয়ে এল এক নতুন সজীবতা। অদূরেই দেখলাম তামিল চারণকবি তিরুভাল্লুবরের ১৩৩ ফুট উঁচু মূর্তি। নির্দিষ্ট সময় শেষে ভেসেলে করে হাওয়ায় দোল খেতে খেতে  আবার ফিরে আসলাম এপারে। এবারে যাওয়ার পালা তিনসাগরতীরের সুন্দর মন্দির কন্যাকুমারীতে। ফেরিঘাট থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে পৌঁছে গেলাম মন্দির। সেখানে পুজো দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পুরান প্রসঙ্গটি এই মন্দির কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। পদ্মের উপর দণ্ডায়মান গ্রানাইট পাথরের দেবীমূর্তি চিত্তাকর্ষক। 'তিন দিকের তিনরঙা অনন্তের আঁচল গায়ে টেনে আকাশমুকুটিনী  ভারত কুমারী অসীমের পানে তাকিয়ে'। দেবীর নোলকের হীরকখণ্ডের দ‍্যুতি বহুদূর থেকেও দৃশ‍্যমান। পূজা দিয়ে মন্দির দর্শন শেষে হোটেলে ফিরে নিজের মত করে মনের ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় প্রত‍্যেকেই ব‍্যস্ত। কেউ কবিতা লিখে দিয়ে গেল তো কেউ লিখতে শুরু করল বিবেকানন্দের দৃষ্টিকোণ নিয়ে। আর আমরা মনোনিবেশ করলাম প্রকৃতির মায়াতানকে ক্যামেরাবন্দি করতে। দুপুরের আহার শেষে ইতিহাস প্রসিদ্ধ ভাট্টাকোটাই ফোর্ট, গান্ধীজীর চিতাভস্ম বিসর্জিত গান্ধীমন্ডপম দেখে সন্ধ্যেবেলা কাটল লেডি অফ রনসম চার্চে। চার্চ থেকে বেরিয়ে পায়ে হেঁটে ঘুরে আসা হলো মন্দির প্রাঙ্গণের সামনে পযর্ন্ত। বেশকিছু দোকান রয়েছে সেখানে শাড়ী, কন‍্যাকুমারীর পটচিত্র, ঘর সাজানোর সামগ্রীর। হোটেলে ফিরে ডিনার শেষে গুছিয়ে নেওয়া হল জিনিসপত্র। প্রকৃতির আবিলতায় আশ্চর্য স্বপ্ন বিন্দুতে তিনদিন কাটিয়ে অপার শান্তি ও অনাবিল আনন্দ নিয়ে রওনা দিলাম কলকাতার উদ্দেশ্যে... মনভোলানো চোখ জুড়ানো সেই সৌন্দর্য‍্য একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে হৃদয়ে চিরআসীন হয়ে রইল।

No comments:

Post a Comment

প্রতি মাসের জনপ্রিয় লেখা