Monday, 3 August 2020

অভীক গুচ্ছাইৎ

কচুর ক্লাবের রাজভোজন
অভীক গুচ্ছাইৎ


          রবিবার সকাল। মারাত্মক গরম। সকালে উঠে পড়াশোনা সেরে চান‌ করে বসেছি। ওমনি বাইরে থেকে বাজখাঁই গলায় ডাক," কী রে হুলো, বেরুবি না?" এক দৌড়ে বারান্দায়। গিয়ে দেখি বুরুদা। সেই হিরোর মতন চুল, থ্যাবড়া নাক আর ভামবিড়ালের মতো কান। এবার বলল, " আয়রে"।
          বুরুদা আর বিল্টের মুখ দেখে আমি গোবেচারার মতো মুখ করে তাড়াহুড়োয় মাকে বলেই ছুটলাম। তিন‌ পা নেমেছি, ব্যাস্! এক রাম আছাড়। তারপর, হাঁটু ছিঁড়ে নদীর জলের বেগে রক্ত বইছে। বুরুদা আর বিল্টে ছুটে এলো। মা তো দেখেই এক পাড়া কাঁপানো চিৎকার, তারপর ফ্ল্যাট্। বাবা আসার আগেই ম্যানেজ করতে হবে, নইলে পিঠে রয়্যাল বেঙ্গলের থাবা। বুরুদা আর বিল্টে আমায় চ্যাংদোলা করে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে ওষুধ আর জল দিতে রক্ত পড়া থামল। তারপর মায়েরও ফিরল জ্ঞান। আর মলমপট্টি করে মা রান্নাঘরে যেতেই, বিল্টে আর বুরুদা টানা আধঘন্টা লেকচার দিল। তারপর বুরুদা বলল, " পাড়ার লোকগুলো এমন হাড়কিপটে, ক্লাব খুলব একটা টাকা বের করে না। বলে কিনা, " ছেলেমানুষ আবার ক্লাব খুলবে কোন্ সাধে? কুড়ি জন দু'শো টাকা ক'রে দিয়েছে। বুরুদা বিল্টেকে বলল, "তা'লে কত হল বল্?" বিলটে তো এক নম্বরের গাধা, পরীক্ষায় সাতবার ডাহা ফেল, বলল, "৫০০ টাকা।"
             বুরুদা রেগে বলল, "তোর মাথা! হিসেব-নিকেশ আদৌ জানিস্? সব মিলিয়ে চার হাজার টাকা।" এর মধ্যে মা চপ রেখে গেছে, চোখের নিমেষে বুরুদা ছ'টা চপই মেরে নিল। আমরা একটাও পেলাম না। বললে তো পিঠে এক ঘুষি! তাই চুপ করে গেলাম। চপ সাঁটিয়ে এক চোঙা ঠেঁকুর তুলে বুরুদা বলল, "এই যে হুলো মহাশয়, আপনি পাঁচশো টাকা দেবেন।" আমি থতমত খেয়ে বললাম, " কেন অত কেন, টাকা কি গাছে হয়?" বুরুদা গম্ভীরস্বরে বলল, "কেন দিবিনা, তুইতো চেয়ারম্যান!" তবু চুপ করব না, করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে। উত্তেজিত গলায় বললাম, " আমি কী পাব?" বিল্টে ফস্ করে বলল, "সম্মান"।
বুরুদা ওর মুখে চপের গুঁড়ো ছুড়ে বলল," রাজার ভোজন"। শুনে আমার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। "কী খাওয়াবে!" বুরুদা শেয়ালের মতো মুখ করে বলল, " কচুর পোলাও, কচুর ডালনা, কচুর চপ...."। "ব্যাস" আমি চেঁচিয়ে বললাম। " যথেষ্ট শ্রীমান, টাটা বাইবাই, আবার যেন‌ দেখা না পাই"।
মনে মনে বললাম," কচুর ক্লাবের কচুর ভোজন, দুত্তোর"!
 

পূর্বালী দে

লোডশেডিং
পূর্বালী দে


হঠাৎ আলো গুলো ধপ করে নিভে গেল। চারিদিক জুড়ে অন্ধকার, চারপাশের মানুষগুলো কালোর প্রতিমূর্তি। সকলে খুঁজছে বাতি, লন্ঠন, এমারজেন্সি লাইট - কিন্ত পাচ্ছে না। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে ট্রেনের কু-ঝিকঝিক শব্দ, ঝিঁঝিঁর ডাক, লোকের ফিসফিসানি। এই সময় যত আবদার ঠাকুমার কাছে। ব্যস শুরু হল; গল্পের ঝুড়ি থেকে গল্প বলা। কিছুক্ষনের জন্য চারপাশে জোনাকির আলো, মায়াময় কাহিনী সৃষ্টি করেছে। হঠাৎ তুতাই কাকার গলা জড়িয়ে বলল, '' এরকম অন্ধকার হল কেন''? 
    কাকা বলল, "আরে একে বলে লোডশেডিং"। তাই তো এমন হল।

সুজিত রেজ








 

ভাইবোন
সুজিত রেজ



টাপুর-টুপুর ভাইবোন বৃষ্টি হলে নাচে,
শীতকালেতে মগডালেতে কাশতে কাশতে হাঁচে।

হাঁচির শব্দ শুনে কোকিল বসন্তকে ডাকে,
কাকের বাসা খুঁজে পেতেই ডিমের সাজি রাখে।

কাকতো জানে তারই ছানা মানুষ করে স্নেহে ,
একটু বড় হলেই কুহু ফিরে যায় তার গেহে।

তরুণ কুমার সরখেল

 

ডাকাবুকো ছেলের গল্প
তরুণ কুমার সরখেল


    বনে-জঙ্গলে রাত-দিন টো টো করে ঘুরে বেড়ায় ছেলেটি। গাছের ডালে বসে পাখিরা নিজের মনে ডাকে। তাই দেখে ছেলেটিও তাদের মতো ডাকতে চেষ্টা করে।

    তখন সবে সন্ধ্যে হয়েছে। ছেলেটি গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল একটি লরি গোঁ-গোঁ শব্দে জঙ্গলে ঢুকছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে লরির ড্রাইভার এই জঙ্গলের পথ বেশ ভালো ভাবেই চেনে। কেননা লরিটি গাছ-গাছালির ফাঁক-ফোঁকর গলে অনেক খানি ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ছেলেটি একটু দূর থেকে দেখল চার-পাঁচ জনের একটি দল গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। তাদের হাতে করাত মেশিন, মোটা দড়ি, কুড়ুল ইত্যাদি। ছেলেটির পাশ দিয়েই তারা হেঁটে ভেতরে ঢুকে পড়ল। গাছপালার আড়াল থেকে ও শুনতে পেল একটি লোক বলছে, “এখানে মোটা গুঁড়ির মেহগনি গাছ রয়েছে তা আগে জানতে পারলে কবেই মাল হাপিস করে দিতাম।”

    কথা বলতে বলতে পুরো দলটি এগিয়ে চলল। আর পিছনে পিছনে খুব সাবধানে এগোতে লাগল ডাকাবুকো ছেলেটি।

    ডাকাবুকো ছেলেটির নাম আসান। সে থাকে জঙ্গল লাগোয়া একটি গ্রামে। গ্রামের সবাই তাকে হরবোলা নাম দিয়েছে। তবে সে এখনো পুরোপুরি হরবোলা হতে পারেনি। বাঘ-সিংহের ডাক নকল করতে না পারলেও ছেলেটি অনেক রকম পাখির ডাক ডাকতে পারে। এছাড়া কুকুরের ডাক, ছাগলের ডাক, গোরুর ডাক খুব সুন্দর নকল করতে পারে। বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে আসান খুব আনন্দ পায় এটা গ্রামের সবাই জেনে গেছে।

        রাত তখন সবে আটটা কি ন-টা। করাত মেশিন দিয়ে মেহগনি গাছ কাটার তোড়জোড় করছিল দলটি। ঠিক সেসময় খুব কাছেই রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিয়ে একটি দাঁতালের ডাক শোনা গেল। সেই দাঁতালের ডাক শুনে পিলে চমকে গেল লোকগুলোর। দলমা থেকে হাতির পাল নেমে এসে এই বনে ঢুকে পড়েছে নির্ঘাৎ। একবার দাঁতালের দল হুড়মুড় করে কাছে চলে এলে আর রক্ষে থাকবে না। নিরুপায় হয়ে মেহগনি গাছের লোভ ছেড়ে চটপট যন্ত্রপাতি গুটিয়ে নিতে লাগল তারা। আরো একবার ডাক দিল দাঁতাল দলটি, খুব কাছেই। না, আর একটুও দেরি করা চলবে না। পড়িমরি করে ছুট লাগাল পুরো দলটি। তারপর লরির আলো না জ্বালিয়ে পথ চিনে চিনে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গেল একসময়।

   

    ফাঁপালো বাঁশের টুকরোটা, যেটার মধ্যে জোরে ফুঁ দিয়ে আসান হাতির ডাক ডেকেছিল সেটা কোমরে গুঁজে নিঃশব্দে বন থেকে বেরিয়ে এল। যাক, এবারের মতো সে মেহগনি গাছগুলো রক্ষা করতে পেরেছে। অন্ধকারে গ্রামে ফিরে এলো আসান।

বাপ্পা দাস







 

কালো কাকের শখ
বাপ্পা দাস 


দেখে বিলে সাদা বক 
কালো কাক সাধে শখ।
তারও সাদা হওয়া চাই।
সাদা রঙের কৌটাতে
এক ডুব দিল তাই।
সাদা রং মেখে গায়ে 
ভাগাড়েতে খেতে যায়।
লেগে দাগ বলে কাক,
'সাদা মোটে ভালো নয় 
দাগ লেগে কালো হয়।'

সুতসোম মন্ডল







 

ছোট পাখি
সুতসোম মন্ডল 


ছোট পাখি ছোট পাখি 
                   আয় না হেথায় নাচি নাচি।
কর না একটু খেলা
                   কাটে না যে আমার বেলা।
চলনা ঘুরতে যাই
                   আনন্দে ডানা মেলাই
যাবি না তুই যাবি না ? 
                   তবে তুই কানা,তুই কানা ।

প্রশান্ত ভৌমিক







 

আদর চাই
প্রশান্ত ভৌমিক


ছোট্ট বলেই কথায় কথায়
ডেকো না আর বাঁদর,
তার চেয়ে নয় গালটা টেনে
করলে আমায় আদর।

লক্ষীমন্ত ছেলে আমি
যে যাই বলুক না,
দুষ্টুমিতে আমার যে তাই
নেইকো তুলনা।

বর্ণা দত্ত







 

বাংলা তুমি পাখি হয়ে যাও

বর্ণা দত্ত


বাংলা তুমি পাখি হয়ে যাও
    তোমার পালকে পালকে 
       লেখা থাক 
             নানান শব্দরা।

তোমার বিষ্ঠাতে থাক
       শব্দের বীজ
   যেখানেই বসবে
         একটি ভাবি অঙ্কুর নিশ্চিত।

সুনন্দ মন্ডল







 
কিশলয়
সুনন্দ মন্ডল

ছোট্ট পায়ে হেঁটে যাও আগামীর কুঁড়ি
বইয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে ফোটাও ফুলঝুরি।
শব্দ পিঁড়ি সাজিয়ে ছুটে চলো দিগন্তে
হাতের যশে বাড়িয়ে তোলো শক্তি সীমান্তে।

বেগবতী নদীর মতোই উচ্ছল তোমাদের প্রাণ
সীমাহীন ঔজ্জ্বল্যে শুষে নাও সব ঘ্রাণ।
কিশলয় তোমরা, একদিন আলোর ভবিষ্যৎ,
জীবনচক্রে গেঁথে রাখো আঁধার যত রাত।

বদরুদ্দোজা শেখু

খেজুর বনে বাঘের মুখে
বদরুদ্দোজা শেখু


আমার এক মামাতো নানার চাচাতো ভাই ছিল ইমরান নানা। গাঁজা দিয়ে হুঁকো টানতো। যেমন তাগড়াই জোয়ান তেমনি তার হিম্মৎ আর উপস্থিত বুদ্ধি।


সে অনেককাল আগের কথা। তখন সাগরদিঘির মনিগ্রাম ভূমিহর এলাকা জুড়ে ছিল বিস্তীর্ণ শালবন। তার আশপাশে প্রচুর খেজুরবন ও তালবন ছিল। শালবনে বাঘ থাকত।

ইমরান নানা, শীতকালে ভূমিহরের খেজুরবনে রস লাগাত। তার মাথায় থাকতো পাগড়ি, হাতে পাকানো সড়কি- লাঠি, গামছা-বাঁধা কোমরে ধারালো হেঁসো, মোটা রশি, কাঁধে রসের কলসীর বাঁহুক। দুপুর থেকে সে গাছ থেকে রস নামাতে শুরু করতো, শেষ ক'রে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা হ'য়ে যেত।

একদিন হলো কি---- তখন প্রায় রাত আটটা হবে। পূর্ণিমার রাত। তখনও তার রস নামানো শেষ হয়নি। উঁচু গাছের মাথার গোড়ায় সবে উঠেছে, আর একটা চিমকুটে  দুর্গন্ধ পেলো। নীচে তাকিয়ে দ্যাখে, একটা শেলা বাঘ গাছের গোড়ায় এসে শুয়েছে আর তার দু'টো বাচ্চা, ঠিক বিড়ালের মতো, তার গায়ে পিঠে উঠে লাফালাফি ক'রে খেলা করছে। বাঘটা উপরে তাকিয়ে আছে। চোখদুটো আগুনের গোলার মতো  জ্বলছে! নানার তো চোখচাঁদি লাগার জোগাড়। সব্বোনাশ!
আর তো সকাল না হ'লে সে নামতে পারবে না! বুদ্ধি ক'রে সে তক্ষুণি তার রশি দিয়ে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে শক্ত ক'রে খেজুর গাছের সাথে বেঁধে  ফেললো যাতে সে অজ্ঞান হ'য়ে গেলেও প'ড়ে না যায়। সে খেজুরগাছের ডগায় বাঁধা, আর নীচে সেই বাঘিনী তার বাচ্চাদের নিয়ে ব'সে। আসলে ও মানুষের গন্ধ পেয়েছে।

 ওদিকে রাত বারোটা বেজে গেলেও ইমরান বাড়ি না ফেরায় তার বাড়িতে কাঁদাকাটা শুরু হলো। তাকে নিশ্চয় বাঘে খেয়েছে। পরদিন সকালে তার ভাইয়েরা সবাই খেজুরবনে ছুটলো তাকে খুঁজতে। বনের ভিতর এক জায়গায় দেখল, রসের কলসী বাঁহুক লাঠি নামানো আছে। গাছের গোড়ায় মাটিতে বাঘের আঁচড়ের দাগ, পেচ্ছাবের দুর্গন্ধ। উপর দিকে তাকিয়ে দেখল, ইমরান গাছের ডগার সাথে বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞান হ'য়ে গাছকে আঁকড়ে' ধ'রে আছে। গাছে উঠে রশি খুলে সবাই তাকে ধরাধরি ক'রে কোনোমতে নীচে নামিয়ে, ঘাড়ে ক'রে বাড়িতে নিয়ে এলো। সারাদিন সেঁকাপোড়া ক'রে তবেই তার জ্ঞান ফেরে। হুঁকো খেয়ে এক সপ্তাহে সুস্থ হয়।

তারপরেও সে ওই বনে রস লাগাতে যেত। কিন্তু বিকাল গড়ালে আর ওখানে থাকতো না। বাড়ি এসে হুঁকো টানতো আর রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরী করত।

পারমিতা দে








সময়
পারমিতা দে


সময় যে খুব দুরন্ত,
এমনিতে ভালোই আছি! 
মাঝে মাঝে দুঃখে আক্রান্ত, 
এই নিয়েই তো আমরা বাঁচি।
সময়ের মাঝে লুকিয়ে আছে 
কত দুঃখ কত আনন্দ, 
শীত-গ্রীষ্ম যেমন আসে
তেমনি আসে বসন্ত।।


 


হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

 
                 


 

 

বন্দিজীবন
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়


আজকে যারা হাত পা মুড়ে
ঘরের মধ্যে বন্দি
তারা কি কেউ ভেবেছিল
চলবে নাকো ফন্দি?
ইচ্ছেমতো গাছ উড়িয়ে
পুকুর বোঝাই করে
অমানুষের কাজ করেছি
তাই তো এখন ঘরে।

প্রতি মাসের জনপ্রিয় লেখা