ডাকাবুকো ছেলের গল্প
তরুণ কুমার সরখেল
বনে-জঙ্গলে রাত-দিন টো টো করে ঘুরে বেড়ায় ছেলেটি। গাছের ডালে বসে পাখিরা নিজের মনে ডাকে। তাই দেখে ছেলেটিও তাদের মতো ডাকতে চেষ্টা করে।তখন সবে সন্ধ্যে হয়েছে। ছেলেটি গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল একটি লরি গোঁ-গোঁ শব্দে জঙ্গলে ঢুকছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে লরির ড্রাইভার এই জঙ্গলের পথ বেশ ভালো ভাবেই চেনে। কেননা লরিটি গাছ-গাছালির ফাঁক-ফোঁকর গলে অনেক খানি ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ছেলেটি একটু দূর থেকে দেখল চার-পাঁচ জনের একটি দল গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। তাদের হাতে করাত মেশিন, মোটা দড়ি, কুড়ুল ইত্যাদি। ছেলেটির পাশ দিয়েই তারা হেঁটে ভেতরে ঢুকে পড়ল। গাছপালার আড়াল থেকে ও শুনতে পেল একটি লোক বলছে, “এখানে মোটা গুঁড়ির মেহগনি গাছ রয়েছে তা আগে জানতে পারলে কবেই মাল হাপিস করে দিতাম।”কথা বলতে বলতে পুরো দলটি এগিয়ে চলল। আর পিছনে পিছনে খুব সাবধানে এগোতে লাগল ডাকাবুকো ছেলেটি।ডাকাবুকো ছেলেটির নাম আসান। সে থাকে জঙ্গল লাগোয়া একটি গ্রামে। গ্রামের সবাই তাকে হরবোলা নাম দিয়েছে। তবে সে এখনো পুরোপুরি হরবোলা হতে পারেনি। বাঘ-সিংহের ডাক নকল করতে না পারলেও ছেলেটি অনেক রকম পাখির ডাক ডাকতে পারে। এছাড়া কুকুরের ডাক, ছাগলের ডাক, গোরুর ডাক খুব সুন্দর নকল করতে পারে। বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে আসান খুব আনন্দ পায় এটা গ্রামের সবাই জেনে গেছে।রাত তখন সবে আটটা কি ন-টা। করাত মেশিন দিয়ে মেহগনি গাছ কাটার তোড়জোড় করছিল দলটি। ঠিক সেসময় খুব কাছেই রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিয়ে একটি দাঁতালের ডাক শোনা গেল। সেই দাঁতালের ডাক শুনে পিলে চমকে গেল লোকগুলোর। দলমা থেকে হাতির পাল নেমে এসে এই বনে ঢুকে পড়েছে নির্ঘাৎ। একবার দাঁতালের দল হুড়মুড় করে কাছে চলে এলে আর রক্ষে থাকবে না। নিরুপায় হয়ে মেহগনি গাছের লোভ ছেড়ে চটপট যন্ত্রপাতি গুটিয়ে নিতে লাগল তারা। আরো একবার ডাক দিল দাঁতাল দলটি, খুব কাছেই। না, আর একটুও দেরি করা চলবে না। পড়িমরি করে ছুট লাগাল পুরো দলটি। তারপর লরির আলো না জ্বালিয়ে পথ চিনে চিনে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গেল একসময়।ফাঁপালো বাঁশের টুকরোটা, যেটার মধ্যে জোরে ফুঁ দিয়ে আসান হাতির ডাক ডেকেছিল সেটা কোমরে গুঁজে নিঃশব্দে বন থেকে বেরিয়ে এল। যাক, এবারের মতো সে মেহগনি গাছগুলো রক্ষা করতে পেরেছে। অন্ধকারে গ্রামে ফিরে এলো আসান।

No comments:
Post a Comment