পঞ্চমীর প্যাঁচে
অভীক গুচ্ছাইৎ
পঞ্চমীর বিকেল। দু'দিন আগেই মায়ের প্রতিমা চলে এসেছে। পুজোর মন্ডপ সাজানো হচ্ছে, চেয়ার ফ্যান ইত্যাদি আনা হচ্ছে, কালকের অনুষ্ঠানের জন্য স্টেজ সাজানো হচ্ছে। আমি, বুরুদা আর বিল্টে চেয়ারে বসে আছি। পুজোর গন্ধে মেতে বুরুদাও আছে খোশমেজাজে। হঠাৎ করুন স্বরে ব্যাজার মুখ করে বলল, " হুলো, তুইতো এক টাকাও দিবি না, আর বিল্টে! ও তো বিশ্ববিখ্যাত সেরা কৃপণ। গতবছরের পুজোয় বললাম, বিল্টে কিছু খাওয়া একটু মুখসুদ্ধি করি। ও নবাবি ভঙ্গিতে বলল, নো চিন্তা আমি করাব তোমার মুখসুদ্ধি, দিয়ে ব্যাটা নিয়ে এলো একটাকা দিয়ে দুটো হাজমোলা। ওকে আবার বলব!" আমিই বললাম,"কী খাওয়ার জন্য এত আঁকুপাঁকু করছ শুনি?" বুরুদা করুন সুরে বলল, "আইসক্রিম!" তারপর হঠাৎই লাফিয়ে উঠে বলল, " ঐ তো মিত্তিরদের ছেলে, আমি আমার শকুনেরও বাড়া চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি ওর পকেটে পঞ্চাশ টাকার নোট। দাঁড়া, এমন প্যাঁচ কষব না!" বিল্টে ভয়ে বলল," ওকে প্যাঁচে জড়াচ্ছ কেন, তাও আবার এই পুজোর সময়, ও তোমার কোন্ জন্মের শত্রু? তোমার ঘোর পাপ হবে।" "ধুত্তোর তোর পাপ, আমিতো শুধু রসিকতা করছি, আর কী শুধু আমার জন্য, তোরাও তো আছিস।" আমি উৎসাহের সঙ্গে বললাম, " তা কী করবে বুরুদা শুনি।" বুরুদা মিচকে হেসে বলল, " শোন, ওর পকেটে পঞ্চাশ টাকা, ও তো হাবাগাধা, ওকে একটা বড় সাইজের কুড়িটাকার কিনে দিয়ে, বাকিটায় আমরা আইসক্রিম খাব। হুঁ হুঁ এইজন্যই আমার নাম বুরু।" বিল্টে শুনেই উদাসীন হয়ে বলল," ছিঃ ছিঃ বুরুদা, তুমি পুজোর দিনে এরকম চালিয়াতি করবে! খাব না আমরা তোমার চোরাই আইসক্রিম। কী বলিস হুলো?" আমিও গোবেচারার মত বললাম, "আমি ও খাব না তাহলে।" শুনেই বুরুদা রেগে বাজখাই গলায় বলল, " ঠিক আছে যা যা, ঘরে বসে মাছের মুড়ো খা গে। তোরা কি আর এসব রসিকতা বুঝবি? বাট মাইন্ড ইট, ঐ মিত্তিরদের ছেলে যেন এই ষড়যন্ত্রের গোঁড়াটুকু না জানতে পারে, তাহলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব তোদের।" বুরুদার ধমক, তাই আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একটু পরে যেই মিত্তিরদের ছেলে এসেছে, ওমনি বুরুদা দু'লাফে ওর কাছে ছুটে গিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, " শোনো ভাই মিত্তির, তুমি বরং এখানে বোসো, আমি তোমার জন্য একটা খাসা আইসক্রিম নিয়ে আসছি, তুমি টাকাটা আমাকে দাও।" শুনে তো মিত্তির একেবারে লাফিয়ে উঠে টাকাটা বুরুদার হাতে নিয়ে দিল। কিন্তু সে কি আর জানে বুরুদা ভেতরে ভেতরে কত বড় প্যাঁচ কষছে। বুরুদা ছুট্টে দোকানে গিয়ে একটা পেল্লায় আইসক্রিম আর নিজের জন্য একটা মাঝারি সাইজের নিয়ে দোকানে পঞ্চাশ টাকা রেখে হাওয়া হয়ে গেল। মিত্তিরকে ধরিয়ে বলল, " হে হে ভাই মিত্তির, তোমার জন্য একটা দারুন আইসক্রিম এনেছি, মজাসে খাও, আমি চললাম।" পরদিন সকালে আমরা যেই ঐ চত্তরে গেছি ওমনি বিহারী দোকানদার বুরুদার দিকে গম্ভীর ভাবে তাকিয়ে বলল, " এই ছোকরা ইধরকে এসো, কাল তোমি যে বড়ো আইসক্রিমঠো লিয়ে ছিলে সেটোর দাম পঞ্চাশ রুপিয়া আছে, আর তুমি যে কোনটা চাঁটছিলে সেটোর দাম তিরিশ রুপিয়া, তুমিতো জলদি জলদি পালিয়ে গেলে, নাও এখন চটপট তিশ রুপিয়া বাহার করো।" বুরুদার চোখতো কপালে উঠে গেল। নিজের প্যাঁচে নিজেই জড়িয়ে পড়ল। আর আমাদের মনে একটাই কথা ঘুরপাক খেতে লাগল, " অতি চালাকের গলায় দড়ি।"