আলোক জ্যোতির সাথে বর্ণা দত্ত
অনেক অনেক দিন আগেরকার কথা তখন আমার বয়স কতই বা হবে এই ধরো বারো কি তেরো এর বেশী তো নয়ই যাইহোক, সেদিন রাতের পড়া শেষ করে খেয়েদেয়ে খুব তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছিলাম কারণ ভোরবেলায় উঠতে হবে পরদিন ভোর বেলায় পঁচিশে বৈশাখ, স্কুল থেকে প্রভাতফেরীতে যেতে হবে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মাকে বললাম, ভোরবেলা ডেকে দিতে।
যথারীতি ভোরবেলা তবে,ভোরবেলা বললে ভুল হবে একটু বেশী ভোরবেলা বলেই মনে হয়েছিল ,আমি তো উঠে গেট খুলে বাইরে বেরিয়েছি, সেদিন ছিল ভরা পূর্ণিমা, আকাশে বিরাট চাঁদ, তার আলোয় চারদিক্ ঝলমল্ করছে। এমন সময় কোথা থেকে খুব গভীর আর তীব্র একটি আলোক রশ্মি মনে হল আমার থেকে কিছুটা দূরেই মাটির খুব কাছাকাছি স্থির হয়ে রয়েছে যাকে পূর্ণীমার ঝলমলে আলোর মধ্যেও আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল। ঐ আলোক রশ্মির টানে আমি যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই দিকে ছুটছিলাম, ও যেন আমায় পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, এই ভাবে আমি জানি না কতটা পথ সেদিন ছুটেছিলাম। তারপর হঠাৎ এক জায়গায় এসে আলোক রশ্মিটা থেমে গিয়ে মিলিয়ে গেল আর যেখানে এসে থেমে মিলিয়ে গেল অদ্ভুত লাগছিল সেই জায়গাটা, একদম অচেনা, একটি জানালা, বহু পুরোনো একটি বটগাছ তার নীচেই একটি পুকুর, বট গাছটা নুয়ে আছে পুকুরের জলের উপর। আর কিছুটা দূরে একটি ঘর, ঘরের ভিতরে একটি জানালা রয়েছে, জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটি বাচ্চাছেলে আর দেখলাম পুকুর ভর্তি মাছ কিন্তু অদ্ভুত ঐ দৃশ্য মিলিয়ে যেতে লাগল আস্তে আস্তে, মন্ত্র মুগ্ধের মতো সেই পরিবেশ। ঐ দৃশ্য মিলিয়ে যেতে না যেতেই দেখলাম সেই জায়গাটি ছোট্ট ছোট্ট গাছ আর সুন্দর সুন্দর ফুলে ভরে উঠেছে কিন্তু সেসব ও একসময় উধাও হয়ে গেল এবার দেখলাম বিড়াট একটি নদী, অপুর্ব সুন্দর তার দুই পাড়ের দৃশ্য ।নদীতে একটি বড়ো নৌকো তার মধ্যে দুধ সাদা রঙ্গের ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত একজন, মায়াবী আলো আর তাঁর ভিতর থেকেও যেন এক আলোকজ্যোতি ঠিকরে বেড়িয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল আমার ,বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে আমার চোখের দৃষ্টি আবদ্ধ হয়ে গেল কতগুলো হলুদ আলোক বিন্দুর উপর যা আমাদের গাঁয়ের বাড়িগুলোতে দেখতে পাই।একের পর এক দৃশ্য দেখছি আর একটি একটি করে মিলিয়ে যাচ্ছে, ভয়ঙ্কর এক আনন্দ আর উত্তেজনার মধ্যে চোখ যখন ডুবে রয়েছে ঠিক সেই সময় আর একটি চমকপদ দৃশ্য, সেই আলোক জ্যোতি অনেকটা জায়গা জুড়ে বহু গাছগাছালিতে ঘেরা একটি জায়গায় ছোট্ট একটি চারাগাছ কে পরম যত্নে মাটিতে বসিয়ে এবং তাতে জল দিচ্ছিলেন আর তাঁর চারপাশে প্রচুর প্রচুর আলোক রশ্মিরা ভীড় করে রয়েছে।
আমি আশ্চর্য হয়ে ঠায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলা, কিন্তু এরপর যা ঘটল রীতিমতো মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না সেই আলোক জ্যোতি একটি টেবিলের উপর খাতার পর খাতা লিখেই চলেছেন…
তারপর দেখছি, একের পর এক মলাট বাঁধানো বই তাঁর চারদিকে কেউ একজন থরে থরে সাজিয়ে দিচ্ছে আর তিনি লিখেই যাচ্ছেন… এমন সময় মায়ের হাতের আলতো ঠেলা অনুভব করলাম আর সেই সঙ্গে শুনতে পেলাম, "কিরে উঠ, সকাল হয়ে গেছে তো, স্কুল যাবি না? প্রভাতফেরীতে যেতে দেরী হয়ে যাবে তো।"

No comments:
Post a Comment