Saturday, 3 October 2020

সৌজন্য চক্রবর্ত্তী


বারীন বাবুর বুড়োমি

সৌজন্য চক্রবর্ত্তী


                  বারীনবাবুর হয়েছে বেজায় বিপদ। দাঁত গুলো যে এরকম বেইমানি করবে তাঁর সাথে তিনি ভাবতে পারেননি। সত্তরের কোঠা পার হতে চললো অথচ দাঁত গুলো দেখো দিব্যি খোশমেজাজে মুখের ভেতর আস্তানা গেড়ে বসে আছে। কিছুতেই পড়তে চায় না। 

বারীনবাবু তাঁরই প্রাণের দোসর সুবীরবাবুকে আজ সকালে চা খেতে খেতে বলছেন," এ কি জ্বালা হয়েছে বাপু দাঁত গুলোকে নিয়ে, খেতে, শুতে, বসতে মুখের ভেতর জোঁকের মত চিটিয়ে আছে অষ্টপ্রহর! সত্তর বছর পার হতে গেলো, বল দেকি।"

সুবীরবাবুর বক্তব্য,"আহা, এতো ভালো জিনিস, আমায় দেখ, সে কোন কালে অর্ধেক দাঁত বিদেয় জানিয়েছে। তোর তো খুশি হবার কথা।"

বারীনবাবু বললেন,"খুশি না ছাই। আচ্ছা বুড়ো হলাম কিজন্য বলি, সারাজীবন যদি বেয়াক্কেল দাঁত গুলো থেকেই গেলো, তাহলে এত কষ্ট করে বুড়ো হওয়ার কি মানে! পাড়ার বেয়াদপ ছোকরাগুলো পর্যন্ত রাগায়, জোয়ান বলে।"

সুবীরবাবু আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে, "আচ্ছা , তোর কি মাথাটাতা বিগরোল নাকি, না মতিভ্রম?

ভালই তো এখনও সব চিবোতে পারিস। শক্ত দাঁত নিয়ে গর্ব করবি কোথায় তা না..."


..."তা না…" কথা কেড়ে নিয়ে বারীনবাবু নাকি সুরে বললেন,"... জানিস এই বিটকেল দাঁত গুলোকে বিদেয় করতে কত কি না করেছি। গোপাল ডাক্তারের কাছে তিন মাস হোমিওপ্যাথি ট্রিটমেন্ট করিয়েছি। তাতেও না পড়ায়, ও পাড়ার কোবরেজ মশাইয়ের দেওয়া টোটকা, পুরিয়া তিনবেলা স্নান করে দাঁতে লাগিয়ে তারপর জামরুল পাতার সাথে গোলমরিচ আর শুকনো সাজিমাটি বেটে ঘসেছি  চল্লিশ বার। উল্টে তাতে দাঁতের জৌলুশ যেন আরো চোদ্দো গুণ বেড়ে গেলো।"

সুবীর বাবু হাসতে হাসতে বললেন," তুই পাগল..." 

"....তারপর শোন, বিশু রাখালের কথা মত চিনেমাটি, কাঁচা হলুদ এমনকি সিমেন্টের ইঁট পর্যন্ত চিবোতে বাদ রাখিনি । তাতে দাঁত গুলো যেনো আরো শক্ত হতে আরো ভালোভাবে এঁটে বসলো। 

এই নিয়ে গিন্নির সাথে কি কম ঝগড়া হয়েছে?

ছেলেটাও শেষে বুঝিয়ে পারেনি!

এখন কি যে করি..."বারীন বাবু গম্ভীর হয়ে বলে চললেন।



এতক্ষণ পড়ে মনে মনে ভাবছেন তো, এ তো আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেলো। বারীনবাবুর নির্ঘাত মাথার ব্যামো। নইলে কেউ এই বয়সে দাঁত পড়েনি বলে রাগ করে! কিন্তু বারীনবাবুর দাঁত এর প্রতি আক্রোশের কারণ তাঁর নিজের তৈরি অদ্ভুত ধারণা...


         ...তিনি ভাবেন এই তিনকাল গিয়ে চারকালে এসে ঠেকেছেন। এখন যদি দাঁত না পড়ে, তাহলে ছেলে, বৌমা, নাতি নাতনিরা কি বলবে!... "বুড়ো ভাম, এখনও দাঁতের বাহার দেখো না!" আর তা ছাড়া নাতনি দুটো বিচ্ছু হয়েছে, ওদের বোঝানো মুশকিল যে উনি বুড়ো হয়েছেন, এই বয়সে অমন রাম চিমটি কাটলে কার না লাগে, বোঝাতে গেলে ফ্যাচ ফ্যাচ করে হেসে বলে, "দাদু, তোমার তো দাঁতই পড়েনি, ফোকলা না হলে কিসের বুড়ো।"

বলো দেখি এরকম অপমান তাও আবার হাঁটুর বয়েসি বাচ্চার কাছে। ছ্যা ছ্যা...


                                       তারপর থেকেই ঠিক করলেন এই দাঁত রাখা যাবে না। যেকোনো উপায়ে হটাতে হবে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। দাঁত বাবাজি দিব্যি হাঁক পাড়িয়ে বসে রইলেন তেমনি দেমাকে। 

এদিকে ঘুমের মধ্যেও বারীনবাবু দেখেন দাঁত গুলো সব মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর দিকে তাকিয়ে হ্যা হ্যা করে হাসছে আর বলছে,"বুড়ো হবি? বুড়ো হবি?"

কি লজ্জা!

এভাবে আর থাকা যায় বলো?

কিন্তু দাঁত তোলাতে বললেও আবার উনি ভয় পেয়ে মানা করেন, এই বয়েসে দাঁত তোলালে যা যন্ত্রণা তা উনি সহ্য করতে পারবেন তো!

              কিন্তু কি আর করা যায়! তাঁকে বোঝাতে বোঝাতে একে একে বন্ধু সুবীর, এমনকি বউ মালতীও তাকে ছেড়ে চিরদিনের মত চলে গেলেও দাঁত গুলো যেতে চাইলনা, তাঁর প্রতি একটু বেশিই মায়া জন্মে গেছে বোধহয় দাঁতগুলোর। 

এ কেমন রাক্ষুসে প্রেমরে বাবা!

পঞ্চাশ বছর ধরে স্কুলের টিচার এর মাইনা আর পেনশন জমিয়ে বেশ ভালই টাকা পয়সা করেছিলেন বারীন বাবু। একটু কিপটেও ছিলেন বোধহয়। কিন্তু দাঁত সরাবার জন্য সব খরচা করতে রাজি ছিলেন তিনি।


            যাইহোক, একদিন ছেলে আপিসের কাজে বাইরে, আর বৌমা, নাতি-নাতনীদের নিয়ে বাপের বাড়ি যাওয়ার সুযোগে একা পেয়ে ডাকাত পড়লো তাঁর বাড়িতে। তাঁর হাত পা দুটো বেঁধে সিন্দুকের চাবি ভেঙে টাকা পয়সা, গয়না-গাটি সব নিয়ে চলে যাচ্ছিলো ডাকাতের দল। সারারাত ওই ভাবে পড়ে থাকলে নির্ঘাত মারা যেতেন বারীনবাবু। 



কিন্তু কে জানত, সেই চির শত্রু দাঁতই বড়ো বন্ধু হয়ে দেখা দেবে তখন। দাঁত দিয়ে দড়ি কেটে মুক্ত হয়ে, চট করে টেলিফোনটা করে থানায় না জানালে ডাকাতের দল ধরাও পড়তো না, আর তাঁর সাধের সম্পত্তিও সব চলে যেত।


         বারীনবাবু দেখলেন দাঁত গুলো এখনও দিব্যি মজবুত আছে। তাছাড়া ক্ষতি তো কিছু করছে না, বরং উপকারই করেছে। এবার থেকে বুক ঠুকে পাড়ার ছোকরা গুলোকে বেশটি করে বলে দেবেন,"দেখ, এই বয়সেও তোদের মত লোহার কড়াই চিবিয়ে খেতে পারি।"

আর নাতি নাতনিদের খুনসুটি না হয় একটু ভালোবেসে সহ্যই করে নেবেন বারীনবাবু।


          ... যাক, এতদিনে বারীনবাবুর মতি ফিরেছে। ছেলেকে ডেকে বললেন,"হ্যাঁ রে বাবলু, বুঝলি, আমি ঠিক করেছি দাঁত গুলোকে আর তোলবার চেষ্টা করব না, ওরা না হয় থাক ওদেরই মত।"

No comments:

Post a Comment

প্রতি মাসের জনপ্রিয় লেখা